একের পর এক নৃশংস হত্যাকা-, শিশুধর্ষণ, ধর্ষণের পর শিশু ও নারী হত্যা এবং মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হওয়ার মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে শিশু মেয়েরা বেশি ধর্ষিত হচ্ছে। শিশুদের ওপর এমন পাশবিক হয়ে ওঠার নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে, মসজিদ-মাদ্রাসার শহরে কেন শিশুরা ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার শিকার হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ প্রতিরোধে ইসলামি অনুশাসন সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে। ইসলাম সবসময় নারীর অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দেয়। নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নাম ‘নিসা’ বা নারী। আবার সুরা বাকারা, আল ইমরান, মায়েদা, আহজাব ও নূর ইত্যাদিতে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সংক্রান্ত বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
ইসলামে বিবাহবহির্ভূত যে কোনো যৌনাচারকে ব্যভিচার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলাম ধর্ষণকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। কারণ বিবাহবহির্ভূত যেকোনো যৌনসঙ্গমই ইসলামে অপরাধ। ধর্ষণও ব্যভিচার। ইসলামি আইনমতে ধর্ষকের শাস্তি ব্যভিচারকারীর শাস্তির অনুরূপ। তবে অনেক ইসলামি স্কলাররা ধর্ষণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যভিচার সম্পূর্ণভাবে হারাম। এটা শিরক ও হত্যার পর বৃহত্তম অপরাধ। কোরআনে কারিমে এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ Ñ সুরা আল ইসরা : ৩২। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘ব্যভিচার কোরো না’ এর তুলনায় আল্লাহর বাণী ‘ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না’ অনেক বেশি কঠোর। এর অর্থ যে-সব বিষয় ব্যভিচারে ভূমিকা রাখে সেগুলোও হারাম।
হাদিস দ্বারা ধর্ষণের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়। হজরত ওয়াইল ইবনে হুজর (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এক নারীকে ধর্ষণ করা হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) ওই নারীকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি, তবে ধর্ষককে হদের (কোরআন-হাদিসে বহু অপরাধের ওপর শাস্তির কথা আছে। এগুলোর মধ্যে যেসব শাস্তির পরিমাণ ও পদ্ধতি কোরআন-হাদিসে নির্ধারিত তাকে ‘হদ’ বলে) শাস্তি দেন।’ Ñ ইবনে মাজাহ : ২৫৯৮। ধর্ষণের ক্ষেত্রে একপক্ষে ব্যভিচার সংঘটিত হয়। আর অন্যপক্ষ হয় নির্যাতিত। তাই নির্যাতিতের কোনো শাস্তি নেই। কেবল অত্যাচারী ধর্ষকের শাস্তি হবে। ধর্ষণের সঙ্গে যদি আরও কোনো অপরাধ সংযুক্ত হয়- যেমন ভিডিওধারণ, ওই ভিডিও প্রচার, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদিÑ তাহলে আরও শাস্তি যুক্ত হবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদ- দেওয়া এবং যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশ’ বেত্রাঘাত করা হলো শাস্তি। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য। ইসলাম নারী-পুরুষের বিয়ে বহির্ভূত দৈহিক মিলনকে দ-নীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে ধর্ষকের স্বীকারোক্তি অথবা সাক্ষ্য না পাওয়া গেলে আধুনিক ডিএনএ টেস্ট, সিসি ক্যামেরা, মোবাইল ভিডিও, ধর্ষিতার বক্তব্য ইত্যাদি অনুযায়ী ধর্ষককে দ্রুত গ্রেপ্তার করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। শাস্তি কার্যকরের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের। কোনো ব্যক্তি বা সমাজ এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অগ্রাধিকার পাবে। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, শাস্তির কঠোরতার একমাত্র উদ্দেশ্য ন্যায়, শান্তি ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
অনেকক্ষেত্রে ধর্ষিতাকে একঘরে করে রাখা হয় কিংবা তাকে বঁাঁকা চোখে দেখা হয়। নানা কারণে তার পরিবারকে হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়, প্রলোভন দিয়ে মিটমাট করার কথা বলা হয়। এগুলোর কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম নারীকে বিনোদন কিংবা বিপণনের মাধ্যম হিসেবে নয় বরং মানুষ তথা আল্লাহর পরিপূর্ণ সৃষ্টির সৌন্দর্যে বিকশিত দেখতে চায়।
লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক
Leave a Reply