এডি ডেস্ক : নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশায় থানায় গিয়েও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে ব্যর্থ হন ভুক্তভোগীরা। বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে অপমানিত ও নিরাশ হয়ে ফিরতে বাধ্য হন তাঁরা। এর মাত্র আট দিন পর নিজ ঘর থেকেই উদ্ধার করা হয় মাহমুদা আক্তারের (৩৫) রক্তাক্ত নিথর দেহ। পুলিশের এই অমানবিক ‘অসহযোগিতা’, দায়িত্বহীনতা ও পেশাগত ব্যর্থতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে এবার বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন নিহতের পরিবার।
রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে এই লিখিত অভিযোগ জমা দেন নিহতের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মুক্তা আক্তার। লিখিত অভিযোগে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় তদন্ত, কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগের অনুলিপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি বরাবরও প্রেরণ করা হয়েছে, যাতে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বে বিবেচিত হয়।
নিহতের পরিবার ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত আক্তার হোসেন একজন চিহ্নিত অপরাধী এবং ধর্ষণ মামলার জামিনপ্রাপ্ত আসামি। গত ১২ মার্চ সকালে আক্তার হোসেন তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মুক্তা আক্তারকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওই দিনই মুক্তা আক্তার ও তাঁর ননাশ (স্বামীর বড় বোন) মাহমুদা আক্তার স্থানীয় বাঞ্ছারামপুর মডেল থানায় জিডি করতে যান। তাঁদের সঙ্গে সাক্ষী হিসেবে আরও তিনজন প্রতিবেশী উপস্থিত ছিলেন।
মুক্তা আক্তারের অভিযোগ, থানায় উপস্থিত হয়ে ডিউটি অফিসারকে বারবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও তিনি বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা ও অবহেলার সঙ্গে উপেক্ষা করেন। আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রকার জিডি গ্রহণ না করে তাঁদের কার্যত থানা প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়া হয়। পুলিশের এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন তাঁরা। এর ঠিক আট দিন পর, ২০ মার্চ মাহমুদা আক্তার যখন বাড়িতে একা ছিলেন, তখন ঘাতক আক্তার হোসেন ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।
অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা (৫৪ ডিএলআর ৪২৪ এবং ৫৯ ডিএলআর ৩৪২) অনুযায়ী থানায় আগত কোনো নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ করা পুলিশের জন্য বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য কর্তব্য। পাশাপাশি পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি)-এর ৩৭৭ বিধি অনুযায়ী, কারও জীবনের ওপর হুমকি সংক্রান্ত তথ্য প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই তা ডায়েরিভুক্ত করা আইনগতভাবে আবশ্যক। অথচ বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এসব বিধানকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে চরম অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন, যা সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকের জীবনের মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পুলিশের বক্তব্য: এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনে কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে ঘটনার মূল অভিযুক্ত আক্তার হোসেন এখনো পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত মাহমুদা আক্তারের স্বজনদের আহাজারিতে আকানগর মুন্সিবাড়ির পরিবেশ শোকাবহ ও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছে। মুক্তা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পুলিশ যদি সেদিন তাদের ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করে আমাদের জিডিটা গ্রহণ করত, তাহলে আজ আমার আপাকে এইভাবে প্রাণ হারাতে হতো না। ঘাতকের হাতে নয়, পুলিশের চরম অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণেই আমার আপার মৃত্যু হয়েছে।’
এলাকাবাসীর দাবি, কেবল ঘাতক আক্তার হোসেনকে গ্রেপ্তার করলেই দায় শেষ হবে না; বরং যে পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা, গাফিলতি ও অমানবিক আচরণের কারণে একটি নিরপরাধ প্রাণ ঝরে গেল, তাঁদেরও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply