গংগাচড়ার বেতগাড়ী একরামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসায় আরবি প্রভাষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, দুই সপ্তাহেও নেয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা
আবু রায়হান, রংপুর ব্যুরো
রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী একরামিয়া বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক মো. কারিমুল ইসলাম প্রামানিকের শিক্ষক নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্রকে জাল ও ভুয়া বলে উল্লেখ করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ NTRCA প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেও প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
NTRCA-এর সহকারী পরিচালক (পরীক্ষা মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন-৩) ড. এস এম আতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত ৩ জুন ২০২৬ তারিখের এক স্মারকে বলা হয়, আরবি প্রভাষক পদে কর্মরত মো. কারিমুল ইসলাম প্রামানিকের দাখিলকৃত শিক্ষক নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, সেখানে মুদ্রিত নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা এবং প্রাপ্ত নম্বরের সঙ্গে NTRCA-তে সংরক্ষিত ফলাফলের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
স্মারকে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১২ সালের ৮ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ৪২৯১৪৩১৯ রোল নম্বরধারী মো. কারিমুল ইসলাম প্রামানিকের দাখিলকৃত প্রত্যয়নপত্রটি সঠিক নয় এবং সেটি ‘জাল ও ভুয়া’ বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
একই চিঠির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে দলিলপত্র পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করে NTRCA-কে অবহিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়।
কিন্তু চিঠি জারির প্রায় তিন সপ্তাহ পরও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো মামলা কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বেতগাড়ী একরামিয়া বহুমুখী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “মাঝখানে ঈদের ঝামেলা ছিল। এরপর মাত্র দুই দিন প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। আমি এখনো চিঠিটি হাতে পাইনি। আগামী রোববার প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চিঠি দেখে এ বিষয়ে বলতে পারব কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারব।”
তবে প্রশ্ন উঠেছে, একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাঠানো গুরুতর অভিযোগসংবলিত স্মারক জারির পরও কেন এতদিন তা কার্যকর হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আরবি প্রভাষক মো. কারিমুল ইসলাম প্রামানিক বলেন, “আমার সনদ জাল নয়, আমি বৈধ। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে চাকরি খাওয়ার জন্য। NTRCA-এর কোনো চিঠি আমি হাতে পাইনি। অধ্যক্ষও আমাকে এ বিষয়ে ডাকেননি। তিনি ডাকলে আমি বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারব।”
স্থানীয় শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, যদি NTRCA-এর যাচাইয়ে প্রত্যয়নপত্র জাল প্রমাণিত হয়ে থাকে, তাহলে একজন শিক্ষক কীভাবে এখনো স্বাভাবিকভাবে চাকরি করছেন এবং বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন? আবার যদি শিক্ষক নিজেকে বৈধ দাবি করে থাকেন, তাহলে দ্রুত তদন্ত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে আরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, একই প্রতিষ্ঠানের শরীরচর্চা শিক্ষক চিনু রানী এবং আরবি প্রভাষক মাছউদুল বারীর বিরুদ্ধে অতীতে মিনিস্ট্রি অডিটে সনদ জাল প্রমাণিত হওয়ার পরও তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করে আসছেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণ করা কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে। বিশেষ করে কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নথি জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, চাকরি বাতিল এবং আর্থিক সুবিধা পুনরুদ্ধারের মতো পদক্ষেপ গ্রহণের বিধান রয়েছে।
এ অবস্থায় NTRCA-এর স্পষ্ট নির্দেশনার পরও কেন এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি।
(প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে NTRCA-এর স্মারকের আলোকে কোনো মামলা দায়ের বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যায়নি।
Leave a Reply