আবু রায়হান, রংপুর ব্যুরো।
মাদক, সন্ত্রাস, চুরি-ছিনতাইসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে আরও সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। একই সঙ্গে তিনি জনগণের সঙ্গে মানবিক, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও পেশাদার আচরণের মাধ্যমে পুলিশি সেবার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘পশুত্ব নয়, মানবিকতাই হোক পুলিশিংয়ের মূল শক্তি।’
বুধবার (১০ জুন) দুপুরে আরপিএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমা, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) তোফায়েল আহমেদ, উপ-পুলিশ কমিশনার (সদরদপ্তর ও প্রশাসন) মো. হাবিবুর রহমান, উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মাহফুজুর রহমান, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মারুফ আহমেদ, উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আবদুর রহমান, সহকারী পুলিশ কমিশনার, বিভিন্ন থানার অফিসার ইনচার্জ এবং বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা।
সভায় জানানো হয়, মে মাসে আরপিএমপিতে মোট ১৪৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে মাদকসংক্রান্ত ৯১টি, অস্ত্র আইনে একটি, নারী ও শিশু নির্যাতনের পাঁচটি, ধর্ষণের দুটি, চুরির ১২টি এবং অন্যান্য অপরাধের ৩৫টি মামলা রয়েছে।
একই সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে ৯২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে ৭ দশমিক ৯৪৫ কেজি গাঁজা, ১ হাজার ২৪৯ পিস ইয়াবা, ৩ দশমিক ২ গ্রাম হেরোইন, ৩০ পিস ট্যাপেন্ডল ট্যাবলেট, ৬ বোতল ফেনসিডিল, ৩০ দশমিক ৭৫০ লিটার চোলাই মদ এবং ২৫ পিস অ্যাম্পুল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ লাখ ৫ হাজার ৫২৫ টাকা।
পুলিশ কমিশনার সভায় মাদক, সন্ত্রাস, চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), থানা, ফাঁড়ি এবং আরপিএমপির সব ইউনিটকে আরও কার্যকর ও সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার করতে হবে এবং মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।
ওয়ারেন্ট তামিল, গ্রেপ্তারি অভিযান ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং টিমভিত্তিক অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সমন্বিত ও পেশাদার অভিযানের মাধ্যমে ঝুঁকি কমিয়ে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় করতে সব পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, পুলিশি সেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে শিষ্টাচার, সততা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও নিষ্পত্তির নির্দেশনা দিয়ে কমিশনার বলেন, এসব মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটর, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর, সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকদের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস বা সমঝোতার সুযোগ নেই এবং এসব মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে।
চুরি ও চোরাই মালামাল কেনাবেচা প্রতিরোধে ভাঙারি ব্যবসার ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, সব ভাঙারি দোকানে বাধ্যতামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যবসায়ী চোরাই মালামাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, ছাত্রাবাস, মেস ও আবাসিক এলাকায় নিয়মিত নজরদারি এবং তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় মানবিক মূল্যবোধের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, মানুষের মধ্যে পশুত্ব ও মনুষ্যত্ব উভয় প্রবৃত্তিই বিদ্যমান। একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে পশুত্বপরায়ণতা পরিহার করে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার চর্চার মাধ্যমে জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের সঙ্গে আচরণে ধৈর্য, সহনশীলতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আরপিএমপির প্রতিটি ইউনিটে কর্মরত কর্মকর্তা ও সদস্যদের কার্যক্রম, শৃঙ্খলা, কর্মদক্ষতা ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ইউনিট প্রধানদের। তাই ইউনিট প্রধানদের নিজ নিজ ইউনিটের সদস্যদের কার্যকর তদারকি, দিকনির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
সভা শেষে পুলিশ কমিশনার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণকে উন্নত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে আরপিএমপির সব ইউনিটকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।
Leave a Reply