মোঃ রিজভী আহম্মেদ রিজোয়ান,নওগাঁ।।
মুসলিম জাহানের জন্য কুরবানি করা মহান আল্লাহর নির্দেশ। পবিত্র ঈদুল আযহা ও কুরবানি ইসলামের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ও আত্মত্যাগের অনন্য ইবাদত। আত্মত্যাগ ও মানবতার বার্তা নিয়ে প্রতিবছরই মুসলিম উম্মাহর সামনে হাজির হয় এই উৎসব। পবিত্র ঈদ উল আযহায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে দা, ছুরি, বঁটি, চাকু, চাপাতি, কাস্তে, কুড়ালসহ পশু কুরবানির জন্য প্রয়োজন পশুর মাংস কাটার লোহার তৈরি বিভিন্নসরঞ্জামের। আর তাই ব্যস্ততা বেড়ে গেছে নওগাঁরকামারপল্লীতে। দম ফেলার মত যেন সময় নেই এ শিল্পের সাথে জড়িত কারিগরদের।
কামার পল্লীগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, হাপরের টানে কয়লার চুলায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। জ্বলে ওঠা আগুনের ফুলকিতে লোহাও হয়ে উঠছে সূর্যবর্ণ। দগদগে গরম লোহায় দিন-রাত হাতুড়ি পেটানোর ঠুকঠাক শব্দে মুখর কামার পল্লীর এলাকাগুলো। শহর থেকে শুরু করে গ্রামে পর্যায়ে কামার পল্লীতে এখন টংটাং শব্দে মুররিত চারপাশ। সবখানেই কর্মব্যস্ততার একই চিত্র। সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ব্যস্ততা বাড়ছে দ্বিগুণ। কামাররা সকলেই এখন ব্যস্ত পুরোনো দা, ছুরি এবং বঁটিতে শাণ দিতে। কেউবা ব্যস্ত নতুন নতুন দা-ছুরি তৈরিতে। তাই দম ফেলার যেন সময় নেই তাদের।
কয়েকজন কামারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা দিয়ে উপকরণ তৈরি করা হয়। স্প্রিং লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান ভাল, তবে দাম বেশি। আর কাঁচা লোহার তৈরি উপকরণগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে কম। এ ছাড়াব্যবহার করা হয় এঙ্গেল, ব্লাকবার, রড, স্টিং, রেললাইনের লোহা, গাড়ির পাত ইত্যাদি, যা দিয়ে ছুরি, কাটারি, বটি, দা ও কুঠার ইত্যাদি তৈরি করে থাকি।মানভেদে পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি ১০০ থেকে ২০০, দা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বঁটি ২৫০ থেকে ৫০০, পশু জবাইয়ের ছুরি ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চাপাতি ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কথা হয় নওগাঁ উপজেলা সদরের কামারশিল্পের সাথে জড়িত রনির কর্মকারের সাথে। তিনি বলেন, ঈদকে সামনে রেখে আমার দোকানে কর্মব্যস্ততা অনেক গুণে বেড়ে গেছে। এ মুহুর্তে দম ফেলারও সময় নেই। পাইকারি ব্যবসার সাথে সাথে স্থানীয় ক্রেতাদের অসংখ্য অর্ডার রয়েছে আমার। বছরের এই সময়টাতে রোজগার বেশি হলেও অন্য সময়ে তুলনামূলকভাবে রোজগার কম হয়। তিনি বলেন মূলত, এটি আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা। আমার বাবা-দাদু কামারের কাজ করতো। তাদেরকে সহয়োগিতা করতেই একাজে আমার জড়িয়ে যাওয়া।
আরেক কারিগর পাল বলেন, ২৫বছর ধরে এ পেশায় আছি। প্রতি বছরই কুরবানির ঈদের জন্য অপেক্ষায় থাকি আমরা। ঈদ মৌসুমে বছরের ভালো টাকা উপার্জন করা যায়। পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করতে লোহার তৈরী ধারালো অস্ত্রের প্রয়োজন হয়। আর এজন্যই ঈদকে ঘিরে কামারদের তৈরি দা, বটি, ছুরি, চাপাতি বিক্রি হচ্ছে এখন।
সদর উপজেলার শিবপুর বাজারের কারিগর রবীন্দ্রনাথ শাহা বলেন, ৩০বছর ধরে এ পেশার সাথে যুক্ত আছি। আয়ের প্রধান উৎস এ পেশা। সারা বছর কম বেচা-কেনা থাকলেও ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে বেশি বেচা-কেনা হয়। আমাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হলে আরও ভালো ভাবে কাজ করতে পারবো।
স্থানীয়দের মতে, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে কামারপাড়ার ব্যস্ততা। এখন থেকেই প্রতিদিন ভিড় বাড়ছে বিভিন্ন কর্মশালায়। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকেও আসছেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি ও শান দিতে।
শুধু লোহা পেটানোর শব্দ নয়, কামারপাড়ার প্রতিটি টুংটাং শব্দ যেন জানান দিচ্ছে গ্রামের মানুষ প্রস্তুত হচ্ছে ত্যাগের মহোৎসব পবিত্র ঈদুল আযহাকে ঘিরে।
Leave a Reply