মোঃ আল আমিন, বেরোবি
উত্তরবঙ্গের শিক্ষার বাতিঘর খ্যাত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। বর্তমানে ২২টি বিভাগে প্রায় সাড়ে আট হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ও শিক্ষার্থীদের বহুল প্রত্যাশিত স্বপ্নের প্রধান ফটক (২ নম্বর গেট) উদ্বোধনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই হারাতে বসেছে তার সৌন্দর্য।
গেটের দুই পাশে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমান দোকানপাটের ভিড়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, নাকি কোনো ব্যস্ত বাজার? এমন চিত্রে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন করা হয় দৃষ্টিনন্দন এই প্রধান ফটকের। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও গৌরবের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়। ফটকের চারপাশে লাগানো হয়েছিল সবুজ ঘাস, বাহারি ফুলের গাছ এবং নান্দনিক আলোকসজ্জা। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। প্রতিদিন বিকেল হলেই প্রধান ফটকের দুই পাশে বসে নানা ধরনের ভ্রাম্যমান দোকান। ফলে নষ্ট হয়েছে ঘাস, ফুলের গাছ ও আলোকসজ্জার ল্যাম্পবাতি। একই সঙ্গে বাড়ছে ময়লা-আবর্জনা ও শব্দদূষণ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাফেটেরিয়ার পাশে দোকান বসানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও অনেক ভ্রাম্যমান দোকানি সেখানে না গিয়ে প্রধান ফটকের সামনেই দোকান বসাচ্ছেন। এতে ফটকের সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের অবাধ চলাচল ও আড্ডার পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ১৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থী বুসরাত জাহান বন্নী বলেন,“মাত্র তিন মাস আগেও মেইন গেটের সৌন্দর্য চোখ জুড়াতো। এখন অতিরিক্ত ভিড়ে হাঁটাচলায় সমস্যা হচ্ছে, শব্দদূষণ তো রয়েছেই। এছাড়া ময়লা-আবর্জনাও পড়ে থাকতে দেখা যায়। তবে শুধু দোকান উচ্ছেদ করলেই সমাধান হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই এসব দোকান পরিচালনা করেন। প্রশাসন চাইলে মূল ফটকের একটু সামনে ডানে-বামে তাদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন,“বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষাও প্রশাসনের দায়িত্ব।”
এআইএস বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আল-আমিন প্রামাণিক বলেন,“বেরোবির সবচেয়ে সৌন্দর্যময় স্থান হলো ২ নম্বর গেট। এখানে বসে আড্ডা দেওয়ারও সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু প্রতিদিন অতিরিক্ত দোকানপাটের কারণে দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা ও ভিড়ের কারণে চলাচলেও সমস্যা হয়। দ্রুত এসব দোকান অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার রহমান বলেন,“একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক শুধু প্রবেশপথ নয়, এটি পুরো ক্যাম্পাসের পরিচয় বহন করে। কিন্তু বর্তমানে গেটের সামনে যেভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দোকানপাট বসছে, তাতে সৌন্দর্যের পাশাপাশি শৃঙ্খলাও নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে দোকানিদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করুক এবং একই সঙ্গে প্রধান ফটকের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করুক।”
ভ্রাম্যমান দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এখানে ব্যবসা করছেন। ভুট্টার দোকানি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ আমার ২০ দিন হয় এখানে দোকান ধরে বসার। কিছু শিক্ষার্থীকে বলছি, তবে প্রশাসনের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।”
খেলনার দোকানি ইমন বলেন, “আমরা এইখানের স্থানীয়। সবাই এখানে দোকান দেয়, তাই আমরাও দেই।”
আরেক দোকানি মুশফিকুর রহমান রিফাত বলেন, “আমার ফ্রেন্ড ভিতরে পড়ালেখা করে। ওনাদের থেকে বলে দেওয়া হয়েছে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরঙ্গন পরিচালক ও প্রক্টর প্রফেসর ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন,“আমরা বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি। এখানে কেউ দোকান বসাতে পারবে না। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
উল্লেখ্য, প্রধান ফটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দোকান বসায় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহল। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বেরোবির স্বপ্নের প্রধান ফটককে আবারও তার চিরচেনা সৌন্দর্যে ফিরিয়ে আনা হবে।
Leave a Reply