জবি প্রতিনিধি :
টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, গরম পানি আর রক্তাক্ত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে গত বছরের ১৪ মে রাজধানীর যমুনামুখী লংমার্চে নেমেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দাবি ছিল তিনটি -আবাসন সংকট নিরসনে আবাসন বৃত্তি, পূর্ণাঙ্গ বাজেট অনুমোদন এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। আন্দোলনের তিন দিন পর দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কিন্তু সেই আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হলেও এখনো সম্পূরক বৃত্তির টাকা হাতে পাননি শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) লংমার্চ টু যমুনা কর্মসূচির এক বছর পূর্তি হয়েছে। তবে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে যেটিকে দেখানো হয়েছিল, সেই সম্পূরক বৃত্তি এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা এবং অনাস্থা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্পূরক বৃত্তির জন্য সরকারের চতুর্থ কিস্তির বরাদ্দ এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে এসে পৌঁছায়নি। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ৫৬ কোটি টাকার কথা বলা হলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইউজিসি থেকে চর্তুথ ইনস্টলমেন্টে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ পাওয়ার আশা করছে।যা মোট বরাদ্দের ৫৩.৫৭ শতাংশ। তবে এই অর্থও এখনো ছাড় হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীরা যে সম্পূরক বৃত্তির টাকার কথা বলছেন, সেটি মূলত সরকারের চতুর্থ কিস্তির অংশ। কিন্তু সেই কিস্তির টাকা এখনো বিশ্ববিদ্যালয় হাতে পায়নি। ৫৬ কোটি টাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে হয়তো এখন ৩০ কোটি টাকার মতো পাওয়া যেতে পারে, যা মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেকের কিছু বেশি।”
তিনি আরও বলেন, “এই ৫৬ কোটি টাকা শুধু শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য নয়।এর একটি বড় অংশ আবাসিক হলের বানী ভবন ও হাবিবুর রহমান হল নির্মাণ কাজের জন্য বরাদ্দ এবং বাকি অংশ শিক্ষার্থীদের বৃত্তির জন্য নির্ধারিত। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও জালানি সংকট ও যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক চাপে সরকার বিভিন্ন খাতে বাজেট সংকোচন করেছে। সেই কারণে ইউজিসিকে বাজেট পুনঃসংশোধন করতে বলা হয়েছে। সংশোধিত বাজেট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই টাকা ছাড় হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, মে মাসের শেষ নাগাদ কিংবা জুনের শুরুতে টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টাকা হাতে পেলেই তা শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে এককালীনভাবে বিতরণ করা হবে। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের ডাটাবেজ ও ব্যাংক তথ্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় যেভাবে দ্রুত দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে তার কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং এক বছরের বেশি সময় পার হলেও শিক্ষার্থীরা এখনো আশ্বাসের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন,তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। বরং আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করা অধিকার বাস্তবায়ন চান। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, “আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে আন্দোলনে নেমেছিলাম। কিন্তু আগের প্রশাসনের ব্যর্থতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখনো আমরা সম্পূরক বৃত্তির টাকা পাইনি। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী এখনো কোনো বাস্তব সুবিধা পায়নি। আমরা শুধু আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই।”
আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছে। জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল বলেন, “সম্পূরক বৃত্তি ছিল যমুনা আন্দোলনের অন্যতম বড় অর্জন। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সাবেক ভিসি ও প্রক্টরের কথায় আমরা আন্দোলন থেকে সরে এসেছিলাম। কিন্তু তারা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমান প্রশাসনও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।”
জবি শিবিরের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল বলেন, “বর্তমান ভিসি ও তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক যমুনা আন্দোলনের সময় তিন দিনের অবস্থানের পর দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেই ভরসাতেই আমরা অনশন ভাঙি। কিন্তু এক বছরেও সম্পূরক বৃত্তির টাকা পাওয়া যায়নি। প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই আমাদের মনে হয়। আন্দোলনের সময় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও পরবর্তীতে যথাযথ ফলোআপ হয়নি।”
জবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি এ কে এম রাকিবও আগের প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, “আগের প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই বৃত্তির টাকা পেতে এত দেরি হচ্ছে। তারা ইউজিসিতে কী সমস্যা হচ্ছে, সেটিও আমাদের স্পষ্টভাবে জানাতেন না। বর্তমান প্রশাসন অন্তত চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। তবে তারা যদি শেষ পর্যন্ত বৃত্তি আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের সেটি পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত।”
জবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফন্টের সভাপতি ইভান তাহসিব বলেন,এটা আমাদের প্রানের দাবি।এ বৃত্তি কতদূর এগোলো এজন্য আমাদের সবার উচিত প্রশাসনকে চাপে মুখে রাখা।
জবি ছাত্রশক্তির সদস্য সচিব শাহীন মিয়া বলেন,আপাতত আমরা প্রশাসনকে সময় দিচ্ছি।যোহেতু তারা নতুন হিসেবে সময় চেয়েছেন।আশা করি রক্ত ঘাম দিয়ে করা যমুনা আন্দোলনের সাথে এই দাবির সাথে প্রশাসন,সরকার,ইউজিসি প্রতারনা করবে না।এই মাসের মধ্যে আমরা বৃত্তির টাকা হাতে পেতে চাই।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন বলছেন, প্রশাসন বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব অনুমোদনের চেষ্টা করছি। অতীতে এটি আদায় করতে না পারা আমাদের ব্যর্থতা ছিল। তবে এখন আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। ইতিবাচক সাড়াও পাচ্ছি। আমাদের সীমাবদ্ধতা ছিল।তবে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সফল হওয়ার চেষ্টা করছি। টাকা হাতে না আসা পর্যন্ত অবশ্যই সফলতা পূর্ণতা পাবে না।”
উল্লেখ্য,শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে মূল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট ও বাজেট বৈষম্য। রাজধানীর অন্যতম বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পর্যাপ্ত আবাসিক হল নেই। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে উচ্চ ভাড়ায় মেস বা বাসা নিয়ে থাকতে হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আবাসন বৃত্তির দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
গত বছরের আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো ছিল-আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন বৃত্তি চালু করা, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট কাটছাঁট ছাড়া অনুমোদন করা এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্প দ্রুত একনেকে অনুমোদন দিয়ে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা।
এই দাবিগুলো নিয়ে ২০২৫ সালের ১৩ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইউজিসিতে গেলেও শিক্ষার্থীদের দাবি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে একইদিন সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁঠালতলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে ‘জবি ঐক্য’ প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়। সেখান থেকেই ‘লংমার্চ টু যমুনা’ কর্মসূচির ঘোষণা আসে।
পরদিন ১৪ মে সকাল থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গরম পানি নিক্ষেপ করা হয়। এতে অন্তত শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী আহত হন। আহতদের মধ্যে ৩৮ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সহকারী প্রক্টরও।
তিন দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচির পর ইউজিসি শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই প্রতিশ্রুতির এক বছর পার হলেও এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-আন্দোলনের মাধ্যমে আদায় করা দাবি কি কেবল আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
Leave a Reply