এম কে পুলক আহমেদ :
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছর পূর্ণ করেছেন। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দেড় বছর শেষে প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির খতিয়ান মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, বড় অংকের মেগা প্রকল্পের ঘোষণা এলেও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সংকটগুলো দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে আবাসন, নিরাপত্তা ও একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান—সবই এখন ‘আশ্বাসের’ স্তরেই আটকে আছে।
১. জমি অধিগ্রহণ ও মাস্টারপ্ল্যান: থমকে আছে স্বপ্ন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত দেড় বছরে বারবার ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের কথা বললেও বাস্তবে এক ইঞ্চি জমিও অধিগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমে থাকা খাস জমি ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে জমি নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে, একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান করার কথা থাকলেও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদী একাডেমিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
২. আবাসন সংকট ও থমকে থাকা উন্নয়ন কাজ
বর্তমানে বেরোবির প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে হলের আসন সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। প্রায় ৬ বছর ধরে বন্ধ থাকার পর ১০ তলাবিশিষ্ট বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রী হল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজ ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় নামে কয়েকজন সাংবাদিক ডেকে উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধন পরবর্তী কাজের গতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম অসন্তোষ রয়েছে। বেরোবির রিসার্চ ইন্সটিটিউটে নামে মাত্র কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর হচ্ছে। এছাড়াও আবাসন সংকটের কারণে ছাত্রীদের মেসগুলোতে অনিরাপদ পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। এছাড়া একাডেমিক ভবনগুলোর ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজও ঢিমেতালে চলায় শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
৩. নিরাপত্তার অভাব ও চুরির মহোৎসব
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। গত দেড় বছরে হল ও একাডেমিক ভবনগুলো থেকে নিয়মিত সাইকেল, ল্যাপটপ ও মোবাইল চুরির ঘটনা ঘটছে। বিজয়-২৪ হলসহ বিভিন্ন স্থানে চুরির ঘটনা শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। বিজয় ২৪ হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা নেই এবং নিরাপত্তারক্ষীদের তৎপরতাও কম। অথচ বড় বড় প্রকল্পের গল্প শুনিয়ে আমাদের সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে।
৪. মেগা প্রকল্পের হাতছানি ও বর্তমান বাস্তবতা
সম্প্রতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৯০ কোটি ১৫ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্প সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । এই প্রকল্পে ১২ তলা একাডেমিক ভবন এবং ৫টি নতুন হল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। উপাচার্য এই প্রকল্পকে বড় অর্জন হিসেবে দেখলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এর আবেদন ম্লান।এর আগের উপাচার্য প্রফেসর ড.হাসিবুর রশীদের সময় থেকে এই মেগা প্রকল্পর কথা শুনে আসতেছিল শিক্ষার্থীরা। বর্তমান উপাচার্য এসেও সেই একই প্রকল্পের গান বলে বেড়াচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শিক্ষার্থীরা বলতেছেন। ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ভবিষ্যতের বড় দালানের চেয়ে আমাদের বর্তমান সংকটগুলোর সমাধান বেশি জরুরি।
৫. ব্রাকসু নির্বাচন ও প্রশাসনিক স্থবিরতা
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ছাত্র সংসদ (ব্রাকসু) নির্বাচনের দাবি জোরালো হলেও তা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্ররা নির্বাচনের দাবিতে আল্টিমেটাম দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান ও জমি অধিগ্রহণের মতো বড় কাজগুলো ঝুলে থাকায় প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শওকাত আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কল রিসিভ করেন নি।
Leave a Reply