সমুদ্রের ভাঙা ঢেউকে সঙ্গী করে শরীর ভাসিয়ে তীরের দিকে ছুটে চলা-এটাই বডি সার্ফিং। ৩২৬ বছরের পুরোনো এই জলক্রীড়ার সূচনা হয়েছিল হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে। ডলফিনের ঢেউ ভেঙে তীরে ফেরার দৃশ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল মানুষ। এবার সেই রোমাঞ্চের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে।
রোববার (১০ মে) সকালে লাবণী পয়েন্টে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে অংশ নেন ৩০ জন বডি সার্ফার। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার একদিন আন্তর্জাতিক বডি সার্ফিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠবে।
আয়োজকদের মতে, বডি সার্ফিং শুধু বিনোদন নয়, সমুদ্র নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কার্যকর। রিপ কারেন্টে পড়ে বিপদে পড়া পর্যটকদের ঢেউ ব্যবহার করে নিরাপদে তীরে ফেরার কৌশল শেখাতেও সহায়তা করবে এই বডি সার্ফিং।
বাংলাদেশ বডি সার্ফিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা জয়নাল আবেদীন বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে প্রায় ৩২৬ বছর আগে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের হাত ধরেই বডি সার্ফিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। গভীর সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে খেলে ডলফিন যেভাবে তীরে ফিরে আসতো, সেই দৃশ্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষ বডি সার্ফিং শুরু করে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের সার্ফিংয়ের মূল ভিত্তিতেই রয়েছে বডি সার্ফিংয়ের উপাদান। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং অলিম্পিকেও সার্ফিং অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ থেকেও দক্ষ বডি সার্ফার তৈরি করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যতে অলিম্পিকে অংশ নেয়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা।
জয়নাল আবেদীন আরও বলেন, সবাই আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলে একদিন বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উড়বে বডি সার্ফিংয়ের মাধ্যমেই। তিনি তরুণদের এই খেলায় আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বডি সার্ফিং শুধু একটি ক্রীড়াই নয়, এটি লাইফ সেভিংয়ের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে লাইফগার্ড ও সৈকতে কাজ করা উদ্ধারকর্মীদের জন্য এই দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে উদ্ধারকাজ শেষে দ্রুত তীরে ফিরে আসতে বডি সার্ফিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, এই সম্ভাবনাময় খেলাটিকে এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। বডি সার্ফিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য।
আরেক প্রতিষ্ঠাতা মো. ওসমান গণি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সার্ফিং ও লাইফগার্ডিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তারা লক্ষ্য করেছেন, অনেক পর্যটক কোমরসমান পানিতেও ঢেউয়ের তোড়ে বিপদে পড়ে যান। তাই সমুদ্রের ভাঙা ঢেউকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর কৌশল জানা থাকলে নিজেকে নিরাপদ রাখা এবং দ্রুত তীরে ফিরে আসা অনেক সহজ হয়।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বডি সার্ফিং জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশে এখনো এর প্রচলন হয়নি। প্রথমবারের মতো কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে এই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছেন তারা। এর মাধ্যমে যেমন স্থানীয়রা নিরাপদ থাকতে পারবেন, তেমনি পর্যটকেরাও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে সমুদ্রে আরও সচেতন ও নিরাপদভাবে সময় কাটাতে পারবেন।
ওসমান গণি আরও বলেন, বডি সার্ফিং শুধু একটি ক্রীড়া নয়, এটি দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা যদি কক্সবাজারে এসে এই ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের প্রতি তাদের আগ্রহ আরও বাড়বে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলাটিকে তুলে ধরতে পারলে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে।
তিনি জানান, প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টে বিনামূল্যে বডি সার্ফিং প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এই প্রশিক্ষণ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বোট ছাড়াই শরীরের ভারসাম্য আর দক্ষতাই বডি সার্ফিংয়ের মূল শক্তি। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ছোট ’হ্যান্ড প্লেন’ এখনো দেশে সহজলভ্য না হলেও স্থানীয় সার্ফাররা নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন সরঞ্জাম। তাদের আশা, এই জলক্রীড়া কক্সবাজারের পর্যটনে যোগ করবে নতুন মাত্রা।
বডি সার্ফার সেলিম বলেন, বডি সার্ফিং মূলত সমুদ্রের ঢেউয়ের গতি ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে করা হয়। এই খেলায় সার্ফিংয়ের মতো বড় বোর্ডের প্রয়োজন হয় না। আন্তর্জাতিকভাবে বডি সার্ফিংয়ে ছোট একটি “হ্যান্ড প্লেন” ব্যবহার করা হয়, যা পানির মধ্যে গতি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সহায়তা করে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে এখনো এই সরঞ্জাম সহজলভ্য নয়। তাই বিদেশে ব্যবহৃত হ্যান্ড প্লেন দেখে তিনি নিজ উদ্যোগে অল্প খরচে একটি তৈরি করেছেন। ভবিষ্যতে স্পন্সর ও সহযোগিতা পেলে আরও উন্নত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সেলিম আরও বলেন, ঢেউয়ের সঠিক গতি ও দিক ব্যবহার করতে পারলে খুব দ্রুত তীরে ফিরে আসা সম্ভব। বিশেষ করে কক্সবাজার সৈকতে অনেক পর্যটক হাঁটু বা কোমরসমান পানিতে নামার পরও রিপ কারেন্টের টানে গভীরে চলে যান। এমন পরিস্থিতিতে বডি সার্ফিংয়ের মৌলিক কৌশল জানা থাকলে ঢেউকে কাজে লাগিয়ে সহজেই নিরাপদে তীরে ফেরা সম্ভব।
তিনি বলেন, হাতের সঠিক ব্যবহার ও ঢেউয়ের সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল রপ্ত করতে পারলে বডি সার্ফিং শুধু আনন্দদায়কই নয়, বরং সমুদ্র নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বডি সার্ফার মো. শুক্কুর বলেন, বডি সার্ফিং অনেক আগে থেকেই তারা অনুশীলন করলেও দেশে এ নিয়ে কোনো সংগঠন বা আনুষ্ঠানিক প্রচলন ছিল না। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শত বছর ধরেই বডি সার্ফিং জনপ্রিয় ক্রীড়া হিসেবে পরিচিত।
মো. শুক্কুর আরও বলেন, কক্সবাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে বডি সার্ফিং কার্যক্রম শুরু করার মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে সমুদ্রমুখী করা এবং সমুদ্র সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। তার মতে, স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকেরা যদি বডি সার্ফিং শেখেন, তাহলে তারা সমুদ্রে আরও আত্মবিশ্বাসী হবেন, সাঁতারে দক্ষতা বাড়বে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে আসবে।
বাংলাদেশ বডি সার্ফিংয়ের উপদেষ্টা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে শুধু সার্ফিং নয়, বিভিন্ন ধরনের জলক্রীড়ারও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি মনে করেন, বডি সার্ফিং সার্ফিংয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; বরং এটি নতুন একটি ক্রীড়া হিসেবে পর্যটন ও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তিনি আরও বলেন, সার্ফিংয়ের মতো বডি সার্ফিংয়ে বিশেষ বোর্ডের প্রয়োজন হয় না, বরং প্রয়োজন নির্দিষ্ট কিছু কৌশল আয়ত্ত করা। স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকেরা সহজেই এই কৌশল রপ্ত করতে পারলে খেলাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উত্তাল ঢেউয়ের বুক চিরে এগিয়ে চলার এই রোমাঞ্চ এখন কক্সবাজারের নতুন পরিচয়। স্বপ্ন- একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ঢেউয়েও উড়বে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।
Leave a Reply