বাংলাদেশ | শুক্রবার, মে ২৫, ২০১৮ | ১১ জ্যৈষ্ঠ,১৪২৫

জাতীয়


Share This With Your Friends


নারায়ণগঞ্জে ৩ ধরনের ভোটে হিসাব পাল্টাতে পারে

newsImg

সকালের কুয়াশা কেটে ভরদুপুরে মিষ্টি ঝলমলে রোদের আলোয় যতটা মেলে প্রাণের উত্তাপ, সন্ধ্যা ঘনাতেই ভোটের শহর দ্রুত ফাঁকা হতে শুরু করে। চাষাঢ়ার প্রাণকেন্দ্র বা বন্দরের ব্যস্ততম কিছু এলাকা ছাড়া বাকি এলাকায় দু-তিন দিন ধরে এমন রূপ দেখা যাচ্ছে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে।

সন্ধ্যায় কেন ফাঁকা হয়ে যায় জানতে চাইলে বন্দরের মুদি দোকানি আয়নাল হোসেন গতকাল রবিবার বিকেলে বলেন, ‘ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আইছে ততই অজানা এক সন্দেহ ভর করতাছে সাধারণ মানুষের মনে। ’ সন্দেহটা কী জানতে চাইলে সন্দিহান হয়েই তাঁর জবাব, ‘এইটা কিন্তু কওন যাইব না। ’

তবে ওই সন্দেহের বিষয়ে বন্দর পাড়ের জগলুল হোসেন বলেন, ‘ওপরে ওপরে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোটটা ভালোয় ভালোয় শেষ হইব কি না, নাকি শেষ বেলায় কোনো গণ্ডগোল হইব—এইটাই সন্দেহ। বিশেষ করে যখন এক পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী চাওয়া হইতাছে, আরেক পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর দরকার নাই বলা হইতাছে তখন সন্দেহটা বাড়তি দেখা যায়। ’

সন্দেহের বাইরে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন প্রার্থীর নজর এখন নিজ নিজ ভোটব্যাংকের দিকে। নিজের পক্ষে ভোট টানার কৌশল হিসেবে এলাকা বা বিশেষ জনগোষ্ঠীকে ঘিরে ছক কষছেন প্রার্থীরা। কারো নজর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দিকে, কারো বা শ্রমিকশ্রেণির দিকে আবার কারো নতুন প্রজন্মের প্রতি। নারী ভোটারদের দিকেও বিশেষ নজর আছে। তবে এ নির্বাচনের শুরু থেকেই একদিকে বিদায়ী মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর ব্যক্তি ইমেজ, আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা, স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভূমিকা; আরেকদিকে বিএনপির ধানের শীষ আর প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে নানামুখী পর্যালোচনা ও জল্পনাকল্পনা চলছেই।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন বন্দরের দড়ি সোনাকান্দায় গফুর মিয়ার চায়ের দোকানে ছোট জটলা করে চায়ে চুমুক দতে দিতে নির্বাচন নিয়ে বিতণ্ডায় মেতে ওঠে কয়েকজন। জব্বার চিশতি নামের একজন উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘এত বেইমান হতে পারুম না। আইভী কী না করছে আমাগো এই বন্দরের লাইগা। ভোট দিতে হয় হেরেই দিমু। ’ প্রতি-উত্তরে পঞ্চাশোর্ধ্ব হারুন মিয়া বলেন, ‘আমরা গতবারে আইভীরে ভোট দিছি। এইবারও দিতাম। কিন্তু হেয় নৌকা লইল কেন? হের (আইভী) লাইগা আদর্শ জলাঞ্জলি দিতে পারুম না। ভোট ধানের শীষেই দিমু। ’

সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের দক্ষিণ এনায়েতনগর এলাকায় যান আইভী। সেদিন আইভীকে দেখেই জড়িয়ে ধরে কপালে ও মুখে চুমু খান ৭০ বছর বয়সী সাবিকুন নাহার। অনেকটা সময় ধরেই ছিল সেই আলিঙ্গন। শেষে তিনি আইভীকে বলেন, ‘মারে, আইছস কষ্ট কইরা, তুই কেরে আইছস? আবার আবি তহন তরে মালা পড়ামু। ’ আবার এর বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে। সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় সাখাওয়াতের গণসংযোগে হঠাৎ ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসেন ষাটোর্ধ্ব শাহিদা বেগম। সাখাওয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘সারাজীবন ধানের শীষে ভোট দিছি। এইবারও তোমারে হেই মার্কাতেই ভোট দিমু। ’

এমন নানা আবেগময় দৃশ্য মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত আইভী এবং বিএনপির অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের জন্য এখন সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ভোটার চুপচাপ থাকলেও অনেকেই আবার প্রকাশ্যে জানান দিচ্ছেন কাকে ভোট দেবেন। আর কেন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে যাচ্ছেন সেটাও তাঁরা বলছেন আত্মীয় বা বন্ধুদের। আর এভাবেই নারায়ণগঞ্জে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটাররা দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ নৌকার পক্ষে কেউবা ধানের শীষের পক্ষে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে ভোট হবে ২২ ডিসেম্বর। এ নির্বাচনটি এবার দলীয় প্রতীকে হওয়ায় জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়ছে বেশি। সেই সঙ্গে মূলত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন ভোটাররাও। তবে তিন শ্রেণির ভোটেই বদলে যাবে ফলের চিত্র—এমনটাই মনে করছেন সিটির অনেক ভোটার। তাঁরা বলছেন, নারী ভোটার, নতুন ভোটার ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর নির্ভর করবে জয়-পরাজয়। এই তিন শ্রেণির ভোটার এবার শুধু দলীয় প্রতীক নয় সঙ্গে ব্যক্তি ইমেজকেও প্রাধান্য দেবেন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। অন্যদিকে তরুণ ভোটাররা বলছেন, প্রথম ভোটটি তাঁরা খুব ভেবেচিন্তেই দেবেন।

২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল চার লাখ চার হাজার ১৮৯ জন। এর মধ্যে ভোট পড়ে দুই লাখ ৮২ হাজার ৫৯৩টি অর্থাৎ শতকরা ৬৯ দশমিক ৯২ ভাগ। ছয় হাজার ২৬৪টি ভোট বাতিল হয়ে যায়। বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৭৬ হাজার ৩২৯। ওই নির্বাচনে মেয়র পদে অংশ নেওয়া ছয় প্রার্থীর মধ্যে শামীম ওসমান (দেওয়াল ঘড়ি) ৭৮ হাজার ৭০৫ এবং সেলিনা হায়াত আইভী (দোয়াত কলম) এক লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়েছিলেন।

এবার মোট ভোটার চার লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ এবং নারী দুই লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯। এবার নতুন ভোটার বেড়েছে ৭০ হাজার ৭৪২ জন, যাঁদের মধ্যে শহরে প্রায় ২৪ হাজার, সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ৩২ হাজার এবং বন্দরে ১৬ হাজার।

গত ৫ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রার্থীরা ছুটে চলেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। দিনরাত চলছে গণসংযোগ ও প্রচার। প্রার্থীরা দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। এর মধ্যে গত কয়েক দিন প্রার্থীদের সঙ্গে প্রচারে দেখা গেছে ভোট প্রার্থনার নানা চিত্র। এর মধ্যে আইভীকে দেখা গেছে নারীদের সান্নিধ্যে একটু বেশি যেতে। আবার সাখাওয়াতকে দেখা গেছে তরুণ ও পুরুষ ভোটারদের সঙ্গে বেশি মিশতে। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া আইভী যেখানেই গেছেন সেখানেই নারীরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে কিংবা ফুলের নৌকা আর তোড়া দিয়ে আইভীকে স্বাগত জানিয়েছেন। অন্যদিকে দিন যতই ঘনাচ্ছে সাখাওয়াতের পেছনে মানুষের লাইনও ততই দীর্ঘ হচ্ছে।

তরুণ ভোটারদের অভিমত : গত কয়েক দিনে আইভী ও সাখাওয়াতের প্রচারকালে কথা হয় বিভিন্নজনের সঙ্গে। শহরের খানপুর ব্যাংক কলোনি এলাকার নাহিন মোজতবা সম্প্রতি তোলারাম কলেজ থেকে বিএ পাস করেছেন। তিনি বলেন, ‘এবার প্রথম ভোটার হয়েছি। প্রথম ভোট দিতে শুধু প্রতীক না, এখানে আমি ব্যক্তি বিশেষকেও দেখব। কারা মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়তে পারবে তাদেরই পছন্দের শীর্ষে রাখব। ’

কিল্লারপুল এলাকার সাইফুজ্জামান বলেন, ‘আমি এবার প্রথম ভোটার। বেশ উচ্ছ্বাস নিয়েই ভোট দিতে যাব যদি পরিবেশ সুষ্ঠু থাকে। প্রথম ভোটটি খুব ভেবেচিন্তে দিব। ’ তিনি এও বলেন, এবার প্রতীকের ব্যাপারটিও বিবেচ্য থাকবে।

কাকে ভোট দেবেন জানতে চাইলে বন্দরের সোনাকান্দা এলাকার মেহেতাজ আক্তার সাফ জবাব দেন, ‘আমাদের এলাকায় যারা রাস্তাঘাট, ড্রেন করেছে এবং ভবিষ্যতে যারা এসব আরো করতে পারব তাকেই দেব। ’

চাষাঢ়া শহীদ মিনারে প্রতিদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আনাগোনা দেখা যায়। সেখানে সরকারি মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সামিরা আক্তার বলেন, ‘আমি বিগত দিনের কর্মকাণ্ড দেখব, তখনই ভোট দেব। ’

নারী ভোটাররা যা বলেন : গত মঙ্গলবার আইভী গিয়েছিলেন মহানগরের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে। ওই সময় এলাকার লোকজন তাঁকে ভোট দেওয়ার আশ্বাস দেন। উত্তর লক্ষ্মণখোলা এলাকার ৮০ বছরের নারী বেল বাহার বলেন, ‘মারে, তরে ভোট দিতে যেতে কষ্ট অইলেও কেন্দ্রে যামু। ’

দক্ষিণ লক্ষ্মণখোলা ট্রান্সমিটার ঘাটলা রোডের ৪৮ বছর বয়সী আছমা বেগম বলেন, ‘মার্কার টাইম নাই, উন্নয়নে আইভী চাই। ’

তবে ভিন্ন রকম কথাও বলেছেন কেউ কেউ। নিতাইগঞ্জ এলাকার ৫০ বছর বয়সী সাবিকুন নেছা বলেন, ‘অনেক তো হয়েছে, ১৩ বছর আইভী চেয়ারে ছিলেন। এবার বোধ হয় মানুষ একটু ভেবেচিন্তে কাজ করবে। ’

সিদ্ধিরগঞ্জ মিজমিজি এলাকার আছিয়া আক্তার বলেন, ‘আইভী নৌকা কেন নিল? আমরা তো নৌকা পছন্দ করি না। সে কারণেই আইভীকে পছন্দ করলেও তাঁকে ভোট দেব না। ’

সংখ্যালঘু ভোটে নজর উভয় পক্ষের : মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে সংখ্যালঘুদের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার ভোট রয়েছে। এই ভোট যার বাক্সে যাবে, তারই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি শংকর কুমার সাহা বলেন, ‘এ ব্যাপারে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আবার বিএনপির কেন্দ্রীয় হিন্দু নেতারাও আমাদের অনুরোধ করেছেন যেন তাঁদের প্রার্থীকে ভোট দিই। ’

আইভী ও সাখাওয়াতের বক্তব্য : সেলিনা হায়াত আইভী বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বিগত দিনে নারীর ক্ষমতায়নসহ নারীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প করেছিল। আমি আশা করি এবারও নারীরা আমার সঙ্গে থাকবে। আর যেখানেই যাচ্ছি প্রচুর নারী আমার কাছে আসছেন, কথা বলছেন। ’ তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘তরুণ প্রজন্মের জন্য এরই মধ্যে অনেক মাঠ আমরা উদ্ধার করেছি। খেলাধুলার মাঠ ঠিক রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর তরুণদের জন্য স্লোগান রয়েছে ‘নয় শঙ্কা নয় ভয়, শহর হবে শান্তিময়’। সাধারণ মানুষের জন্য সাধারণ মানুষ হয়েই দলমত নির্বিশেষে নারায়ণগঞ্জ শহরের উন্নয়নের চেষ্টা করেছি। বিপর্যস্ত নারায়ণগঞ্জ শহর আজ আদর্শ শহরে পরিণত হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের জন্যও আমি অনেক কাজ করেছি। আশা করি সবাই আমার সঙ্গেই থাকবে। ”

অন্যদিকে সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘নারীরা এ সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ, তারা নীরব বিপ্লব ঘটাবে। শহরটি আবর্জনার শহরে পরিণত হয়েছে, যা দেখে তরুণ তো বটেই, সবাই ক্ষুব্ধ। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা বেশ বিচক্ষণ। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তারাই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে বলে মনে করি। তা ছাড়া বিএনপির তো ৬০ শতাংশ ভোট আছেই। ’ সংখ্যালঘু ভোটের বিষয়ে সাখাওয়াত বলেন, আইভীর পরিবার দেওভোগে হিন্দুদের জিউস পুকুর দখল করে রেখেছে। সে কারণে হিন্দুরা তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ।

খবরটি সংগ্রহ করেনঃ- Desk
এই খবরটি মোট ( 177 ) বার পড়া হয়েছে।
add

Share This With Your Friends